হল-মার্কের জমি নিলামে তুলল সোনালী ব্যাংক

জেসমিন মলি ও সাকিব তনু | তারিখ: ২১-০২-২০১৪
বহুল আলোচিত হল-মার্ক গ্রুপের ১ হাজার ৫৭২ শতাংশ জমি নিলামে তুলল সোনালী ব্যাংক। সাভারের তেঁতুলঝোড়া এলাকার এ জমি বিক্রি করে গ্রুপের ছয় প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ৭১০ কোটি টাকা আদায় করতে চায় ব্যাংকটি। এছাড়া অনুসন্ধানকালে গ্রুপটির নন-ফান্ডেড কোনো দায় ফান্ডেড হলে তাও বন্ধকি জমি বিক্রি থেকে আদায় করবে সোনালী ব্যাংক। অর্থ আদায়ে চলতি মাসের মধ্যে মামলা করারও সিদ্ধান্ত হয়েছে ব্যাংকের পর্ষদ সভায়।

url_32788
অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এর ১২(৩) ধারা মোতাবেক গ্রুপটির এ জমি নিলামে তোলা হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করে সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রদীপ কুমার দত্ত বণিক বার্তাকে বলেন, অর্থ আদায় না হওয়ায় হল-মার্কের বন্ধকি জমি নিলামে তোলা হয়েছে। তবে এর মাধ্যমে কী পরিমাণ অর্থ আসবে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। কারণ এসব জমি কেনার ক্ষেত্রে ক্রেতারা অনেক বিষয় বিবেচনা করবেন। সম্পত্তি নিলামে তোলা মামলারই অংশবিশেষ। শুধু যেসব জমি বন্ধকি হিসেবে আছে, কেবল সেগুলোই নিলামে তোলা হয়েছে।  মামলা নিষ্পত্তি হলে অন্য জমির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, হল-মার্ক ফ্যাশনের ৪৫২ কোটি ৩৩ লাখ টাকা আদায়ে নিলামে তোলা হয়েছে ১ হাজার ২৫৮ শতাংশ জমি। হল-মার্ক স্টাইলের ৯ কোটি টাকা আদায়ে নিলাম বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়েছে ৩৪ দশমিক ৩৭ শতাংশ জমির। এছাড়া হল-মার্ক প্যাকেজিংয়ের ১ কোটি ৬১ লাখ টাকা আদায়ে ৭০ শতাংশ, হল-মার্ক অ্যাকসেসরিজের ১০ কোটি ৯২ লাখ টাকা আদায়ে ১৬৫ শতাংশ, ববি ডেনিম কম্পোজিটের ৯ কোটি ৯৩ লাখ টাকা আদায়ে ২৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ ও ওয়ালমার্ট ফ্যাশনের ২২৬ কোটি ২২ লাখ টাকা আদায়ে ২১ দশমিক ২৫ শতাংশ জমি নিলামে তোলা হয়েছে। এসব জমির সঙ্গে স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তিও নিলামে তোলা হয়েছে। নিলাম বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, আগামী ১০ মার্চ বেলা ৩টার মধ্যে সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা হোটেল (সাবেক শেরাটন) করপোরেট শাখায় রক্ষিত বাক্সে দরপত্র জমা দিতে হবে। একই দিন দরপত্র খোলা হবে ও নিলাম অনুষ্ঠিত হবে।
সোনালী ব্যাংক সূত্র বলছে, হল-মার্ক গ্রুপ প্রকৃত মালিক, শুধু এমন জমিই নিলামে তোলা হয়েছে। এর মাধ্যমে হল-মার্কের পুরো ঋণ আদায় হবে না। গ্রুপটি আরো জমি ব্যাংকের কাছে বন্ধক রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু গ্রুপের কর্ণধাররা গ্রেফতার হওয়ায় তা আর সম্ভব হয়নি।
জানা গেছে, অর্থঋণ আদালতে মামলা করার আগে বন্ধকি জমি নিলামে তুলতে হয়। নিলামে বিক্রির অর্থে ঋণ সমন্বয় হলে মামলার প্রয়োজন পড়ে না। পুরো ঋণ সমন্বয় না হলে বাকি ঋণের জন্য মামলা করতে পারে ব্যাংক। পরে মামলার মাধ্যমেই বাকি অর্থ আদায়ের পন্থা বেরিয়ে আসে। বন্ধকির বাইরের জমিও এক্ষেত্রে নিলামে তোলা যায়।
সোনালী ব্যাংকের পরিচালক নজিবুর রহমান এ প্রসঙ্গে বলেন, অর্থ আদায়ে চলতি মাসেই মামলা করা হবে। এর প্রক্রিয়া হিসেবেই জমি নিলামে তোলা হয়েছে। মামলার সংখ্যা হতে পারে ২ থেকে ৫।
জালিয়াতির মাধ্যমে হল-মার্কসহ ছয়টি প্রতিষ্ঠান সোনালী ব্যাংক থেকে আত্মসাৎ করেছে প্রায় ৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। সাতটি সরকারি, ২৯টি বেসরকারি ও পাঁচটি বিদেশী ব্যাংকের ১০০ শাখার মাধ্যমে এসব অর্থ বের করে নেয় প্রতিষ্ঠানগুলো। হল-মার্ক ছাড়া অন্য পাঁচ প্রতিষ্ঠান হচ্ছে— প্যারাগন নিট কোম্পানি, খানজাহান আলী সোয়েটার্স লিমিটেড, ডি অ্যান্ড স্পোর্টস লিমিটেড, টি অ্যান্ড ব্রাদার্স লিমিটেড ও নকশি নিট লিমিটেড। ২০১০ থেকে ২০১২ সালের মার্চ পর্যন্ত সময়ে এসব অর্থ আত্মসাৎ করা হয়।
ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে হল-মার্ক গ্রুপ সোনালী ব্যাংক থেকে বিভিন্ন উপায়ে অর্থ বের করে নিলেও এসব প্রতিষ্ঠানের কর্ণধাররা একসময় হল-মার্ক গ্রুপের কর্মচারী ছিলেন। কর্মচারীদের মালিক সাজিয়ে ও গ্রুপভুক্ত প্রতিষ্ঠানের নামে আমদানি-রফতানি কার্যক্রম চালিয়ে এসব অর্থ বের করে নেন হল-মার্ক গ্রুপের মালিক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর মাহমুদ।
হল-মার্কের অর্থ (ফান্ডেড) লোপাটের ঘটনায় ২০১২ সালের ৪ অক্টোবর ২৭ জনকে আসামি করে ১১টি মামলা করা হয়। তদন্ত শেষে গত বছরের ১২ সেপ্টেম্বর মামলার তদন্ত প্রতিবেদন কমিশনে জমা দেয়া হয়। পর্যালোচনা শেষে গত ১৬ সেপ্টেম্বর ২৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র অনুমোদন করে কমিশন। এছাড়া গত বছরের ১ জানুয়ারি অরো পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ফান্ডেড ৩৫০ কোটি ৩৭ লাখ টাকা জালিয়াতির অভিযোগে ২৬টি মামলা করে দুদক। এতে আসামি করা হয় ৩৫ জনকে।

 

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *