কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বেসরকারি খাতে অগ্রগতি সামান্যই
ইসমাইল আলী ও জেসমিন মলি | ২০১৫-১১-০২ ইং
বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস ও জ্বালানি তেলের ব্যবহার কমাতে চাইছে সরকার। এজন্য জোর দেয়া হচ্ছে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে। এ লক্ষ্যে ২০১১ ও ২০১২ সালে বেসরকারি খাতে বেশ কয়েকটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনেরও অনুমোদন দেয়া হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেগুলোর অগ্রগতি বা বাস্তবায়ন সামান্যই— ৩ শতাংশ বা তারও কম। এ অবস্থায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।
গত ২৭ অক্টোবর কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অগ্রগতি নিয়ে বৈঠক করে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। বৈঠকে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কাজের অগ্রগতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন কমিটির সদস্যরা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাস্তবায়নে বড় জটিলতা অভিজ্ঞতার অভাব। এছাড়া প্রয়োজনীয় জমি ও অর্থসংস্থানের চ্যালেঞ্জ তো আছেই। পরিবেশগত সমীক্ষায়ও প্রচুর সময় প্রয়োজন হয়। ফলে লেটার অব ইনটেন্ট (এলওআই) ইস্যুর প্রায় দুই বছর পেরিয়ে গেলেও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) সঙ্গে চুক্তি করতে পারেনি তিনটি কেন্দ্র।
বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্যমতে, ২০১১ সালে ১ হাজার ৮৮ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক তিনটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে অনুমতি পায় ওরিয়ন। সে বছরের ২৭ জুন কেন্দ্র তিনটি থেকে বিদ্যুৎ ক্রয়ে ওরিয়ন গ্রুপের সঙ্গে চুক্তিও করে পিডিবি।
চুক্তি অনুযায়ী, মুন্সীগঞ্জের মাওয়ায় ৫২২ মেগাওয়াট, চট্টগ্রামের আনোয়ারায় ২৮৩ ও খুলনার লবণচোরায় ২৮৩ মেগাওয়াটের তিনটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করার কথা প্রতিষ্ঠানটির। উৎপাদনে আসার পর কেন্দ্র তিনটিকে ১ হাজার ২৫০ মেগাওয়াটে উন্নীত করার পরিকল্পনাও নেয়া হয়। পরে চট্টগ্রামের প্রকল্পটি স্থানান্তর করে ওরিয়ন। ২৮৩ মেগাওয়াটের প্রকল্প দুটি একীভূত করে খুলনায় ৫৬৬ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ঘোষণা দেয় তারা। এছাড়া মাওয়া কেন্দ্রটিও স্থানান্তর করে নারায়ণগঞ্জের মেঘনাঘাটের পূর্ব পাড়ে বাইজারগাঁওয়ে নেয় ওরিয়ন। ২০১৬ সালের মার্চে মাওয়া ও জুলাইয়ে খুলনার বিদ্যুৎকেন্দ্র দুটির উৎপাদনে আসার কথা। অথচ গত তিন বছরে এক্ষেত্রে মাত্র ৩ শতাংশ অগ্রগতি হয়েছে। মাওয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রটির অর্থায়ন এখনো নিশ্চিত হয়নি। শুধু প্রকল্পটির পরিবেশগত সমীক্ষা অনুমোদন হয়েছে। আর খুলনা বিদ্যুৎকেন্দ্রটির জন্য জমি ক্রয় সম্পন্ন করেছে ওরিয়ন। এ অবস্থায় ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্প দুটির মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে।
এছাড়া ঢাকার পাশেই কয়লাভিত্তিক ৬৩৫ মেগাওয়াটের আরো একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কথা ওরিয়নের। এজন্য এলওআই ইস্যু করা হয় ২০১৩ সালের ৩১ অক্টোবর। এর পর উল্লেখযোগ্য আর কোনো কাজ হয়নি। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে চালুর কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত চুক্তি করতে পারেনি ওরিয়ন।
এদিকে এস আলম গ্রুপ চট্টগ্রাম ও বরিশালে ৬১২ মেগাওয়াটের দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের অনুমোদন পায় ২০১২ সালে। পরে বরিশালের কেন্দ্রটি চট্টগ্রামে স্থানান্তর করে প্রতিষ্ঠানটি। বিদ্যুৎকেন্দ্র দুটি নির্মাণের জন্য ২০১৩ সালের ৩১ অক্টোবর ও ৮ ডিসেম্বর এস আলম গ্রুপের নামে এলওআই ইস্যু করে পিডিবি। তবে এখনো বিদ্যুৎকেন্দ্র দুটি নির্মাণে চুক্তি করতে পারেনি এস আলম। দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর সম্ভাব্য সময় নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২০ ও ২০২১ সাল। যদিও প্রাথমিকভাবে ২০১৭ সালে প্রকল্প দুটি শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়।
এ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে সংসদীয় কমিটি জানায়, দুটি প্রতিষ্ঠানের কাছেই আটকে আছে কয়লাভিত্তিক মোট ২ হাজার ৯৪৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন। দফায় দফায় সময় বাড়িয়ে তারা বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করতে পারেনি। সুতরাং প্রকল্পগুলো তারা বাস্তবায়ন করবে কীভাবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব মনোয়ার ইসলাম বণিক বার্তাকে জানান, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বিষয়ে সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। তাই এসব মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে কিছুটা সময়ক্ষেপণ হচ্ছে। তবে প্রকল্পগুলোর জমি ও ফিন্যান্সিয়াল ক্লোজিংয়ের জন্য মন্ত্রণালয় থেকে সহযোগিতা করা হচ্ছে। আশা করা যায়, দ্রুত এগুলোর কাজ এগিয়ে নেয়া যাবে।
এদিকে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় কয়লা সরবরাহ নিয়েও সন্দিহান বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, দেশীয় কয়লা উত্তোলনে সরকার সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। আর বিদেশ থেকে আমদানিতেও জটিলতা রয়েছে।
জানা গেছে, ২০৩০ সালের মহাপরিকল্পনায় জ্বালানি তেল থেকে ১ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট, আমদানি থেকে ৬ হাজার ৮০০, নিজস্ব কয়লা দিয়ে ১০ হাজার ১০০ ও গ্যাস থেকে ৮ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য ধরা হয়েছে। সে সময় বছরে আমদানি করা কয়লা লাগবে দুই কোটি টনের বেশি। নিজস্ব কয়লা লাগবে বছরে তিন কোটি টনের কিছু বেশি। আর নিজস্ব কয়লা পাওয়া না গেলে পুরোটাই আমদানি করতে হবে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ম. তামিম বলেন, নিজস্ব কয়লা উত্তোলনে সরকার সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। ফলে বছরে পাঁচ কোটি টন কয়লা আমদানিতে বড় ধরনের ঝুঁকি থাকছে। এছাড়া ব্যয় হবে বছরে প্রায় ৪০০ কোটি ডলার। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।
Leave a Reply